লাগামহীন দুর্নীতি করেও দাপটের সঙ্গে টিকে থাকার এক অন্যতম উদাহরণ তাকসিম এ খান। নাগরিক সেবার সরকারি প্রতিষ্ঠান ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হয়েও তিনি স্থাপন করেছেন স্বেচ্ছাচারিতার ন্যক্কারজনক নজির। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির পাহাড় জমেছে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক)।
কিন্তু সব কিছু ম্যানেজে পটু তাকসিম কোনো অভিযোগেরই কোনো তোয়াক্কা করেন না। বরং হয়ে ওঠেন আরো বেপরোয়া। সরকারের উপর মহলের আশীর্বাদ থাকায় দুদক তার টিকিটির নাগালও পাবে না বলে নিজেই দম্ভভরে বলে বেড়ান তাকসিম।
এভাবেই বছর ছয় ধরে ওয়াসায় জেঁকে বসে আছেন বিতর্কিতভাবে নিয়োগ পাওয়া তাকসিম। গড়ে তুলেছেন শক্তিশালী সিন্ডিকেট। বড় বড় প্রকল্প থেকে হাতিয়ে নিচ্ছেন কোটি কোটি টাকা।
বেশির ভাগ সময়ই থাকেন না দেশে দোর্দণ্ড প্রতাপশালী তাকসিম। সরকারি কাজের নামে সরকারের টাকায় আমেরিকান পাসপোর্টে ঘোরেন দেশ-বিদেশ। আর প্রতি ট্যুরেই ঢুঁ মারেন আমেরিকায়।
খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও খুব একটা পাত্তা দেন ‘ঘোড়েল’ তাকসিম। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তাকে ডেকে নিয়ে জনতার মঞ্চের জন্য মামলার শিকার ও বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী ওয়ালিউল্লাকে ওয়াসার ডিএমডি (অর্থ) পদে নিয়োগের নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তাকসিম নিয়োগ দেন জামায়াতের একনিষ্ঠ সমর্থক হিসেবে পরিচিত সৈয়দ গোলাম আহমদকে। আরো অনেক পদে জামায়াত সমর্থক ও কর্মীদের নিয়োগ দেন তিনি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সব অপকর্ম নিয়ন্ত্রণের জন্য নিজের অনুসারি চারজনকে নিয়োজিত করেছেন তাকসিম। এরা হলেন- পদ্মা (জশলদিয়া) পানি শোধনাগার নির্মাণ প্রকল্পের ডিপিডি প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম, এমডির ব্যক্তিগত স্টাফ প্রকৌশলী আকতারুজ্জামান, বিভিন্ন কনস্ট্রাকশনের দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলী মহসিন ও ওয়াসার ক্রয় বিভাগের দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলী আনোয়ার সাত্তার সবুজ। ওয়াসায় যত ধরনের দুর্নীতি, অনিয়ম ও অর্থের লেনদেন হয়-সবই ঘটে এ চার খলিফার হাত দিয়ে।
ওয়াসা কর্মকর্তাদেরই অভিযোগ- সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার পদ্মা (জশলদিয়া) পানি শোধনাগর নির্মাণ প্রকল্পে দুর্নীতির মহোৎসবের নেতা তাকসিম। তেঁতুলঝরা-ভাকুর্তা ওয়েলফিল্ড নির্মাণ প্রকল্প এবং এডিবি ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত আরো একাধিক প্রকল্পেও হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাটে জড়িত তার লোকজন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ওয়াসার তৎকালীন চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফা যখন এমডি পদে নিয়োগ দেওয়ার জন্য তাকসিম এ খানকে দেশে নিয়ে আসেন, তখন ওই পদে প্রার্থী হওয়ার মতো তার কোনো যোগ্যতাই ছিল না তার। তাই এমডি পদের জন্য আবেদন করলে প্রথম দফা মৌখিক পরীক্ষায় অযোগ্য হয়ে যান তিনি। পরে তৎকালীন চেয়ারম্যান কৌশলে চার-পাঁচ জনের নামে মৌখিক পরীক্ষার জন্য পুনরায় চিঠি পাঠান। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন তাকসিম এ খান। কিন্তু দ্বিতীয় দফা মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নিয়েও তিনি যোগ্যতা অর্জনে ব্যর্থ হন। কিন্তু তারপরও ২০০৯ সালে তাকেই নিয়োগ দেওয়া হয় ওয়াসার এমডি পদে।
আমেরিকান পাসপোর্টধারী তাকসিম এ খান এমডি হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পরপরই ব্যাপক দুর্নীতির পাশাপাশি বিদেশ সফর শুরু করেন। এ পর্যন্ত তিনি শতাধিক দেশে গেছেন সরকারি টাকায়। এমডি পদের মেয়াদ বাড়িয়েছেন ভুল তথ্য দিয়ে। বোর্ডের সুপারিশ জালিয়াতি করে নিয়োগ পেয়েছেন তৃতীয় দফায়।
ঢাকা ওয়াসার বেতন নিয়েও ভয়াবহ অনিয়মের চিঠি জমা পড়েছে দুদকে। তাতে দেখা গেছে, ঢাকা ওয়াসার তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের বেতনসহ অন্যান্য সুবিধা যুগ্ম সচিবের চেয়ে বেশি। ওভারটাইম ভাতার মাধ্যমে কর্মচারীরা তাদের বেতন বাড়িয়ে থাকেন। ঢাকা ওয়াসার কিছু ড্রাইভার বেতন ও ওভারটাইম ভাতাসহ প্রায় ৬০ হাজার টাকা পান। আর মোট সাড়ে তিন হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে প্রায় তিন হাজারই এই তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির।
ওয়াসার বিশুদ্ধ পানি প্রকল্প, বোতলজাত পানি ‘শান্তি’ বাজার না পাওয়ার পেছনেও তাকসিমের কারসাজি আছে বলে মনে করা হয়। এখন প্রতিবছর এ খাতে লোকসান হচ্ছে কোটি টাকারও বেশি।
বিগত সরকারের বিদায়ের ঠিক আগ মুহূর্তে ১১৩২ জনকে নিয়োগ দিয়ে ৫০ কোটি টাকার নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগও আছে তার বিরু্দ্ধে।
এছাড়া বেদখল হওয়া খাল উদ্ধার কাজের টাকা মেরে দেওয়ার অভিযোগ আছে তাকসিম এ খানের নামে। কোথায় তিনি কার নামে টাকা রাখেন সে তথ্য জমা আছে দুদকের কাছেও।
এছাড়া নলকূপ স্থাপন, পানির লাইন স্থাপন, লাইন মেরামত, পানি শোধনাগার নির্মাণ, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নে গ্রহণ করা একাধিক প্রকল্পে তার বিরুদ্ধে বড় ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ আছে। আরো আছে পানির লাইনে কারসাজি, কারখানায় কম বিল করা, মিটার রিডিংয়ের দুর্নীতি, গ্রাহকদের বিপদে ফেলে অর্থ আদায়, নিয়োগপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেটদের অবৈধ সম্মানিসহ নগরবাসীর দুর্ভোগেরও নানা অভিযোগ।
৭০ হাজার নিম্নমানের পানির মিটার কেনার পেছনেও তাকসিম এ খানের লোভকেই দায়ী করা হয়।
কার্যত তার অধীনে আসার পরই ঢাকা ওয়াসা একটি খেলাপি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। কিন্তু মাঝেমধ্যেই ক্ষমতাধরদের জন্য ভুরিভোজ আয়োজনে জুড়ি নেই তার। গত ২ মার্চ হোটেল সোনারগাঁওয়ে এমনই এক নৈশভোজ আয়োজন করেন তিনি।
সতর্কবাণীঃ
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং দণ্ডনীয় অপরাধ।


No comments:
Post a Comment